করোনা কালের মাইক্রোফাইন্যান্স- অনিষ্টে ইষ্ট লাভ বা শাপে বর।

5 3 votes
Article Rating

একবার মোল্লা নাসিরউদ্দিন রাতের বেলায় ল্যাম্প পোস্টের নিচে অনেকক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজি করছিলেন কিছু। এই দেখে এক প্রতিবেশী তাকে জিজ্ঞেস করল কী হারিয়েছে এবং ঠিক কোথায় হারিয়েছে। নাসিরউদ্দিন উত্তর দিলেন যে তাঁর টাকা হারিয়েছে এবং সেটা তাঁর বাগানের পিছনে। প্রতিবেশী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন যে তাহলে বাগানের পিছনে না খুঁজে তুমি ল্যাম্প পোস্টের নিচে খুঁজছ কেন? নাসিরউদ্দিন অম্লান বদনে উত্তর দিলেন, বাগানের পিছনে তো অন্ধকার। “করোনা কালের মাইক্রোফাইন্যান্স”


আমার কয়েক মাস সরাসরি মাইক্রো ফিনান্স নিয়ে ট্রেইনিং ও বাস্তব কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে যতটা বুঝতে পারি যে, মাইক্রো ফিনান্স মূলত নাসিরউদ্দিনের মতই যেখানে খোঁজা দরকার সেখানে অন্ধকারের দোহাই দেখিয়ে না খুঁজে এমন একটা পথে চলছে; যেটা করে আসলে শেষ পর্যন্ত যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এর কতটা টিকে থাকা যাবে সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। “করোনা কালের মাইক্রোফাইন্যান্স”
বাংলায় একটা বাগধারা আছে। অনিষ্টে ইষ্ট লাভ বা শাপে বর। যার অর্থ হল এমন কোন দুর্ঘটনা যেটা আদতে সুখবর নিয়ে আসে। আমার কাছে মনে হয় এই করোনাকালীন সময় আসলে মাইক্রো ফিনান্সের জন্য সেইরকমই কোন শাপে বর হতে পারে যদি না এর মেথড পরিবর্তন করে এটি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।
তাহলে মাইক্রো ফিনান্স কীভাবে চলতে পারে এই সময়ে? আসুন এই বিষয় টা নিয়ে সবাই আমরা চিন্তা করি। আর চিন্তা করতে করতে আমি কী চিন্তা করছি এই বিষয়টা নিয়ে সেটা আপনাদের সাথে শেয়ার করি।
এই করোনাকালীন সময়ের সবচাইতে প্রয়োজন হল সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা আবার মাইক্রো ফিনান্স এর মূল ভিত্তি হল মূলত বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমিতি গঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা। একটা জিনিস খেয়াল করেন যে এই করোনাকালীন সময়ে সব বন্ধ হয়ে গেলেও কিন্তু ব্যাংক বন্ধ হয় নি, কারণ এটি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ মানুষের আর্থিক লেনদেন কিন্তু কমবেশি চলেছে।
অপরদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলেও একটা দীর্ঘ সময় মাইক্রো ফিনান্স বন্ধ ছিল। কী কারন এর পিছনে?
প্রথমে আসুন দেখি ব্যাংক এর সাথে এর মৌলিক পার্থক্য টা কোথায়। মৌলিক পার্থক্য টা হল সমিতি গঠনে। অর্থাৎ মাইক্রো ফিনান্স যে শুধু ঋণ দেয় তা নয় এর আরেকটা কাজ হল ইন্সটিটিউট বিল্ডিং করা যা সমিতির মাধ্যমে হয়ে থাকে এবং এভাবে একটা কমিউনিটিকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া। এজন্যই যারা মাইক্রো ফিনান্স বা এনজিও তে কাজ করেন তাঁদের বলা হয় উন্নয়নকর্মী।
তাহলে যদি আমি এই দুর্যোগকালীন সময়ে সমিতি বাদ দিয়ে ঋণ কাজ পরিচালনা করি তাহলে যেমন মাইক্রো ফিনান্সের মৌলিক স্বকীয়তা নষ্ট হবে ঠিক তেমনি এইসময় প্রেশার দিয়ে টাকা উঠাতে গেলে এই মাইক্রো ফিনান্স তাঁর জনপ্রিয়তা তো হারাবেই এক দিক দিয়ে আবার অন্য দিক দিয়ে এর ভবিষ্যৎ হয়ে পড়বে সংকটাপন্ন।

তাহলে প্রশ্ন এসেই যায় যে সেক্ষেত্রে আমরা কী করতে পারি? নিচে কয়েকটা পয়েন্ট তুলে ধরে এর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি।
১) সফটওয়্যার ভিত্তিক অনলাইন সমিতি গঠন ও এর কার্যক্রম পরিচালনা।
২) অনলাইন ট্রানজেকশনের মাধ্যমে টাকা আদায় ও ঋণ প্রদান।
৩) ঋণ দেবার পূর্বে সঠিক প্রকল্প যাচাই এর জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং সেই বিশেষজ্ঞ কর্তৃক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং অবশ্যই তা অনলাইনে।
৪) একত্রে সব টাকা ঋণ না দিয়ে কিস্তি আকারে কিছু কিছু টাকা করে দেয়া যায় কিনা সেই বিষয়টা বিবেচনা করা বা ঋণ এর মেয়াদ বাৎসরিক এর পরিবর্তে প্রতি মাসে শেষ করা। (এই বিষয়টা নিয়ে পর্যালোচনার অনেক বিষয় আছে।) এবং সার্ভিস চার্জ পারলে কিছুটা কমানো।
৫) অতি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। যেসকল সদস্য করোনাকালীন সময়ে নিজেদের পণ্য বাজারজাত করতে পারছেন না তাঁদের জন্য অনলাইনে একটি বাজার সৃষ্টি করা ও তাঁদের পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে সেখান থেকে লাভের একটা অংশ রাখা যেতে পারে।
৬) প্রতিটা অফিসে বিনামুল্যে কিছু স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং করোনা টেস্টের বুথ স্থাপন।
৭) বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে সহায়তার জন্য অনলাইন ভিত্তিক বা সরাসরি অফিস ভিত্তিক হেল্প ডেস্ক খোলা।
৮) যে সকল সদস্য এর বাচ্চারা এই করোনা কালীন সময়ে ঠিক মত পড়াশুনার সহায়তা পাচ্ছে না তাঁদের জন্য অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা।
যাই হোক আমি ব্যাখায় যাবার আগে একটু কথা বলে নেই যে এই বিষয় গুলো কোনটাই পরীক্ষিত নয়, সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব মতামত, আপনি এর সাথে একমত বা দ্বিমত দুইটিই পোষণ করতে পারেন। আরেকটি বিষয়, যেহেতু আমি কাজ করেছি সমন্বিত উন্নয়ন নিয়ে সেহেতু আমার প্রথম ৪ টি পয়েন্ট আর্থিক বিষয় নিয়ে হলেও পরবর্তী ৪ টি পয়েন্ট পয়েন্ট হল সমন্বিত উন্নয়ন এর উপর, তবে এই সমন্বিত উন্নয়নের যে ধারণা নিঃসন্দেহে সেটি আপনার আর্থিক কার্যক্রম কে আরও জনপ্রিয় ও গতিশীল করে তুলবে।

লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আসলে আমার লিখার স্টাইল টাই এমন, আমি গল্প করার ভঙ্গিতে লিখতে ভালবাসি। যাই হোক এতক্ষণ পর্যন্তও যদি কষ্ট করে পরে থাকেন তাহলেও আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। একটু ব্যাখ্যায় আসি তাহলে।
আমার প্রথম পয়েন্ট টা হল সফটওয়্যার ভিত্তিক অনলাইন সমিতি কার্যক্রম পরিচালনা। এখন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই অনলাইনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে লাইভ ক্লাস নিচ্ছে। আমি ফেসবুকের কথা কিন্তু এখানে বলছি না। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা সফটওয়্যার ভিত্তিক কার্যক্রমের কথা বলছি। বর্তমানে প্রায় প্রতি বাড়িতেই স্মার্ট ফোন আছে, সুতরাং সেটি তেমন কঠিন হবে না সদস্যদের কাছে আপনার তথ্য একেবারে সমিতি আকারে পৌছাতে। এই গ্লোবালাইজেসনের যুগে যদি আপনি আপনার কর্মীর হাতে একটি স্মার্ট ট্যাব দিয়েই টাকা কালেকশন করে ভাবেন যে আপনি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলছেন তাহলে বলতে হবে যে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। তবে এক্ষেত্রে সদস্যদের কানেক্ট করতে কর্মী কে ভিডিও কলের মাধ্যমে একটু কাজ করতে হবে বা স্ক্রিন শেয়ার এর মাধ্যমে ভিডিও করে একটু সহায়তা করতে পারে। এই প্রযুক্তির যুগে এসে যদি আপনি বলেন যে আপনার কর্মী এই সকল বিষয়ে এখনও দক্ষ নয় তবে আমার মনে যে মনে হয় যে ভবিষ্যৎ মাইক্রো ফিনান্সে আপনার জন্য টিকে থাকা খুব কঠিন হবে।
দ্বিতীয় পয়েন্ট টা খুব সহজ। এখনও কিন্তু অনেক সদস্য মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে ঋণ প্রদান করে। সেক্ষেত্রে এই বিষয়টা মাথায় রেখে ব্যাংকের মত কোন মোবাইল অ্যাপ বা এরকম কোন মাধ্যম ব্যবহার করে টাকা আদায় এবং ঋণ প্রদান করতে হবে। এতে একইসাথে অনলাইন ডকুমেন্ট থাকবে এবং দূরবর্তী অবস্থানে থেকেও কার্যক্রম করা সম্ভব। এতে করে অবশ্য আইটি দায়িত্বে যিনি থাকবেন তাঁর কাজ বৃদ্ধি পেতে পারে।
তৃতীয় পয়েন্ট টি বর্তমান প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। এইসময় অনেকেই ঋণ চাবে। আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে অনেকবার বলতে গেলে বেশিরভাগ সময় প্রকল্প ছাড়াও ঋণ দেওয়া হয় যাতে করে বকেয়া বেশি পরে। এই সময় সদস্যের সেই চিন্তা টা হতে পারে। সেক্ষেত্রে হেড অফিসে বিভিন্ন প্রকল্পের উপর বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে তাঁর প্রকল্প যাচাই করে পরে ঋণ দিতে হবে যাতে এই সময় ঝুঁকি কম থাকে। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মী কে পূর্বেই সামাজিক যোগাযোগ মেনে খোঁজ নিয়ে আসতে হবে যে উনি যে প্রকল্প দেখাচ্ছেন সেটি সত্যিকার অর্থেই উনার। এবং অবশ্যই ভিডিও কনফারেন্সে সেই কর্মীও যুক্ত হবেন। এক্ষেত্রে অবশ্য বিশেষজ্ঞ দের দিয়ে বিভিন্ন অনলাইন ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করতে পারে প্রতিষ্ঠান।
চতুর্থ পয়েন্ট টা অনেক বেশি বিতর্ক মুলখতে পারে। তবে আমাদের বর্তমান অবস্থানে এমন অনেকেই আছেন যারা একত্রে বেশি টাকা নিয়ে তা হয়তো বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নষ্ট করে ফেলতে পারেন এবং বকেয়া ফেলতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাকে কিস্তি আকারেই একটু একটু করে ঋণ দিয়ে ধীরে ধীরে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করা যায় কিনা সেই বিষয়টা বিবেচনা করা যেতে পারে। আবার ঋণের মেয়াদ বাৎসরিক এর পরিবর্তে মাসিক করতে পারে। কারণ এতে করে একটু একটু করে তাঁর টাকার পরিমাণ ও বাড়ানো যেতে পারে। তবে বিষয়টা অবশ্যই তর্কযোগ্য ও আলোচনা সাপেক্ষে করতে হবে।
পঞ্চম পয়েন্ট টি মূলত বাজার সৃষ্টি করা নিয়ে। এতে করে প্রতিষ্ঠান সদস্য এর মাধ্যমে নিজেও ব্যবসা করতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য যা লাভজনক হতে পারে। অবশ্যই এধরণের প্রতিষ্ঠানের উচিত এসকল বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া। এতে করে দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে তাঁদের সফল মুল্য পেতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন বাজারে ঢুকা ভাল।
ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম এই ৩ টি পয়েন্ট নিয়ে একেবারেই বলব। কারণ ৩ টি পয়েন্ট হচ্ছে সমন্বিত উন্নয়নের সাপেক্ষে যেটি কিনা একটি নতুন ধারণা এবং যেটি ব্যাংক থেকে এনজিও কে পৃথক করে থাকে। কেন শুধু শুধু গ্রাহক এতগুলো ব্যাংক থাকতে আপনার সেবা নিবে যদি না আপনি তাঁদের স্পেশাল কচিহু দেন। এই প্রোডাক্ট গুলো তাঁদের কাছে জনপ্রিয়তা পাবার জন্য শুধু নয় একই সাথে এটি প্রমাণ করবে যে উন্নয়ন মূলক কর্মকাণ্ডে মাইক্রো ফিনান্স শুধু নেয় তা নয় যথেষ্ট ফেরত ও দেয়। এবং এই প্রোডাক্ট গুলো কোন রকম সন্দেহ ছাড়া আপান্র আর্থিক কার্যক্রম কে গতিশীল করবে।
লিখা শেষ। সবাই ৫ মিনিট একটু ভাবুন চোখ বন্ধ করে আমার লিখাটা নিয়ে। আপনার চিন্তার জগতে যদি এতটুকু নাড়া দিতে পারে এই লিখা তাহলেই এই কষ্ট সার্থক। ভালো থাকুন।

মাহ্‌দী যুবায়ের,

বিএসএস, এমএসএস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

“লেখা আহবান” বিষয়- বর্তমান পরিস্থিতিতে মাইক্রোফাইন্যান্স কার্যক্রম । এনজিও, এমএফআই এবং সদস্যগন দিকনির্দেশনা পায় এমন মৌলিক লেখা হতে হবে। www.learnmicrofinance.com
এ পাবলিশ করা হবে, লেখক পরিচিতি সহ । লেখার শুরুতে আপনার সম্পর্কে
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি প্রদান করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে এবং নিজের ছবি সংযুক্ত করুন যদি আপনার ছবি প্রকাশ করতে চান।
নিম্নে উল্লেখিত ই-মেইলে লেখা পাঠাতে হবে –
learnaboutmicrofinance@gmail.com
#মাইক্রোফাইস্যান্স বেসিক বিষয়গুলো জানতে ভিজিট করুন- https://learnmicrofinance.com/microfinance-basics/
#চাকুরী বিজ্ঞপ্তি পেতে ভিজিট করুন- https://learnmicrofinance.com/jobs/
অন্যান্য বিষয় জানতে ভিজিট করুন-
https://learnmicrofinance.com/blog/
*** আপনার লেখা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে মাইক্রোফাইন্যান্স কার্যক্রম সঠিক দিক নির্দেশনা পাবে বলে মনে করি। ধন্যবাদ- www.learnmicrofinance.com

5 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments