“কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যেই বন্যায় আক্রান্ত বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ শিল্প ” – শেখ মঈনুর রহমান

5 1 vote
Article Rating

“কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যেই বন্যায় আক্রান্ত বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ শিল্প “

– শেখ মঈনুর রহমান

করোনা মহামারির মধ্যে দ্বিতীয় দফা বন্যা ভাসছে দেশের উত্তর, উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলের ৩১ টি জেলার ৪০ লক্ষাধিক মানুষ। বন্যার পানি এখন রাজধানীর চতুর্পার্শ্বের চারটি নদীর বিপদসীমার কাছাকাছি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঢাকার পূর্বাঞ্চলের বালু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্বাঞ্চলের নিম্ন এলাকাুমুহ প্লাবিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘূর্ণিঝড় আম্পান দেশের ভেতরে এবং পশ্চিমবঙ্গে যে বৃষ্টিপাত ঝরিয়েছে এবং মুম্বাইয়ে ঘূর্ণিঝড় নিসর্গের বৃষ্টির পানি নেমে আসায় দেশের নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে এই মূহূর্তে ভারত ফারাক্কাসহ তার সব বাঁধের গেট খুলে দেয়ায় এ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এরই সাথে বিভিন্ন স্থানে নদ-নদীর ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাড়ি-ঘরসহ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। 

এনজিওসমূহ হতে ঋণ নিয়ে ব্যবসা, বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদন, হাঁস মুরগির ও গবাদি পশুর খামার প্রতিষ্ঠাকারি অসংখ্য মানুষ সহায়-সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মহামারীর মধ্যে জেলা শহর এবং গ্রামের লাখ লাখ মানুষ ক্ষেতের ফসল, গরু,ছাগল, হাঁস মুরগির খামার, মাছের খামার, শিল্প, সকল ধরনের ব্যবসা বাণিজ্য হারিয়ে অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মধ্যে পড়েছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আগামী ঈদুল আযহা কে উপলক্ষ্য করে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। বিগত বৎসরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী একমাত্র কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করেই দেশে ৪০ হাজার কোটি টাকা আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। দুঃখজনকভাবে সত্যি হল, করোনা ভাইরাসের মহামারীর কারণে স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার কারনে এবছর অনেকেই গরু কোরবানির দেওয়া থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখবেন অথবা এখন পর্যন্ত দ্বিধাগ্রস্থ। একই সাথে সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কোরবানীর পশুর হাট পরিচালনা করার জোর তাগিদ রয়েছে। করোনা ভাইরাস এবং বন্যার কারণে এই বছর উৎপাদিত গবাদি পশু গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে বিক্রয়ের জন্য নিয়ে আসতে পালনকারী, পাইকারি ব্যবসায়ী ও গবাদি পশু বিক্রেতাগন উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। ইতোমধ্যেই গ্রামাঞ্চলে গরুর দাম আশঙ্কাজনকভাবে কম যার ফলে গবাদি পশু পালনকারি ও গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের সাথে জড়িত চাষীদের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি গুনতে হতে পারে। একইভাবে বন্যা কবলিত অঞ্চলের মৎস্য খামার প্রকল্প সমূহের মাছ ভেসে গিয়েছে। মৎস্যচাষীগন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন । যার ফলে মৎস্যসম্পদ খাতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে নিঃসন্দেহে। 

ইতোমধ্যেই করোনা ভাইরাস মহামারীর আকার ধারণ করায় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতিতে চরম স্থবিরতা বিরাজমান। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই ফসল উৎপাদন, প্রাণি সম্পদ এর খামার প্রতিষ্ঠা, ছোট ছোট ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা, হস্তশিল্প, ছাড়াও বিভিন্ন কর্মকা- পরিচালনার জন্য স্থানীয়ভাবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান গুলো হতে ছোট ও মাঝারি ঋণ নিয়ে কর্মকা- পরিচালনা করছেন। করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারন করায় ঋণগ্রহীতা সদস্যগনের প্রায় ৪০-৪৫% সদস্য ঋণের কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধ এ অপারগতা প্রকাশ করে আসছেন। এক্ষেত্রে কিছু অতি দরদী কিছু দরিদ্র প্রেমিক এর ইন্ধন বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যা এপ্রিল/মে মাসে আমার মাঠ পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলাম। এই বিষয়গুলোর সরাসরি প্রভাব দেশের ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর পড়েছে। উল্লেখ্য যে, ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কিস্তি আদায়ের সাময়িক স্থগিতাদেশ সংক্রান্ত মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নির্দেশনা অনুযায়ী ২৭ মার্চ হতে ১৫ মে ২০২০ পর্যন্ত মাঠ ঋণ কার্যক্রম স্থগিত করে। যার ফলে ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ১৮ মার্চ ২০২০ পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের কিস্তি পরিকল্পনা মাফিক আদায় করতে তো পারেইনি উপরন্তু উক্ত সময়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাসিক বেতনসহ ও ঈদ উল ফিতরের বোনাস এবং সকল পরিচালনা ব্যয় নির্বাহ করতে হয়েছে। যদিও কিছু সংস্থা ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও কেবলমাত্র তারল্য সংকট এর কারণে সময়মতো সম্পূর্ণ মাসিক বেতন প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে কোথাও কোথাও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যাইহোক গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী মধ্য মে ২০২০ হতে সীমিত আকারে ঋণ কার্যক্রম শুরু হলে সদস্যদের সঞ্চয় উত্তোলনের চাহিদা ক্ষুদ্রঋণ শিল্পে বাড়তি তারল্য সংকট দেখা দেয়। তথাপি ও ক্ষুদ্রঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে স্ব স্ব সামর্থ্য অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম পুনরায় চালু করে। এখানেও স্থানীয় কিছু সুযোগ সন্ধানী এবং অতি বুঝবান স্বার্থান্বেসী মানুষের র্নিবুদ্বিতার কারনে বাধা গ্রস্থ হয়। এরইমধ্যে মাইক্রো ক্রেডিট রেগুরেটরী অথরিটির নির্দেশনানুসারে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সীমিত আকারে ঋণ আদায় কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। 

এরইমধ্যে বর্তমান বন্যা ও ভাঙ্গনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পুনরায় বাঁধার মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় দফা বন্যায় এখন পর্যন্ত ৩১ টি জেলার ৪০ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে ১৫ টি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছ। জেলাগুলো হলো: কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর। তবে এবার ঐসব জেলাসহ আরো বেশি এলাকা প্লাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশে এখন “শ্রাবন এর মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে; অঝোরে নামবে বুঝি ঝরনি ধরায়ে”—- অবস্থা বিরাজমান। বৃষ্টিপাত এবং নেপাল, চীন, ভারতের উজান থেকে বন্যার পানি আসা অব্যাহত আছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এর ভাষ্য মতে এবারের বন্যা দীর্ঘ স্থায়ী হতে পারে। জাতিসংঘ তো বলেই দিয়েছে যে এবারের বন্যা ১৯৮৮ সালের ন্যায় দীর্ঘ স্থায়ী হবে। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্লাবিত এলাকাগুলোর পানিবন্দি মানুষ এখন সম্পূর্ণভাবে কর্মহীন অবস্থায় সরকারি ত্রাণ নির্ভর হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বলা যায় যে, এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয়বার বন্যায় ফসলহানী ও ব্যবসা বাণিজ্য হারিয়ে বন্যাকবলিত অঞ্চলের জনগণ বড় ধরনের আর্থিক ও মানবিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছেন। এবারও দায় টানতে হবে, গ্রামীণ চালিকাশক্তি “ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে”।

সুতরাং বর্তমান বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টিকে মাথায় রেখে প্রতিটি শিল্পক্ষেত্রের ন্যায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পরিবেশবান্ধব এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় সহণীয় ঋণ প্রডাক্ট ডিজাইন করতে হবে । অর্থাৎ গতানুগতিক ঋণ কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষায়িত ঋণ প্রডাক্ট ডিজাইন করাসহ সামাজিক ব্যবসা এর নতুন নতুন প্রকল্প ও ক্ষেত্র উন্মোচন করতে হবে। এখনই বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরবর্তীতে কৃষি উৎপাদন এর জন্য আমন (রোপা) এবং রবিশস্যের জন্য আগাম প্রস্তুতি মূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করে এই সংক্রান্ত ঋণ বিতরণ পরিকল্পনা নেওযা যেতে পারে । পাশাপাশি মাননীয় সরকারের ঘোষিত তিন হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঋণ সহায়তা সময়মত কাজে লাগানো যায় কিনা সে বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। বিনিয়োগযোগ্য ঋণের যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত না করতে পারলে ভবিষ্যতে ঋণ বিনিয়োাগ করা সংস্থাগুলোর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

সুতরাং সংস্থার নিজস্ব উদ্বৃত্ত তহবিল, পরিচালকগনের নিজস্ব তহবিল, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক হতে ঋণ গ্রহণ করে মাঠ পর্যায়ে বিতরণ করবার পূর্বেই এই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনতে হবে। আর এর মাধ্যমেই টেকসই ক্ষুদ্রঋণদানকারী শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে।

S.M.Moinur Rahman Moin
Livelihood Development and Microfinance & SME
Management Expert at Development Consultant and Global Compliance Initiative (DCGCI)Bangladesh.
—–0—-

#মাইক্রোফাইস্যান্স বেসিক বিষয়গুলো জানতে ভিজিট করুন- https://learnmicrofinance.com/microfinance-basics/
#চাকুরী বিজ্ঞপ্তি পেতে ভিজিট করুন- https://learnmicrofinance.com/jobs/
অন্যান্য বিষয় জানতে ভিজিট করুন-
https://learnmicrofinance.com/blog/

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments